দাম বাড়লেও হলের খাবারের মান নিয়ে অসন্তুষ্ট শিক্ষার্থীরা

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
ফাইল ফটো। ছবি: ক্যাম্পাস রিপোর্ট
ফাইল ফটো। ছবি: ক্যাম্পাস রিপোর্ট

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে হলগুলোর ডাইনিং ও কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়াটিতে খাবারের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। নিরাপদ ও পর্যাপ্ত খাবার থেকে শুরু করে মানসম্মত ও ন্যায্যমূল্যের খাবারের সংকটে ভুগছেন তারা। এ ছাড়া রয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব। 

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হলের ডাইনিংগুলোতে পরিবেশিত খাবার মানহীন এবং দামের তুলনায় পরিমাণে খুবই কম। রান্নার পরিবেশও সবসময় অপরিষ্কার ও অস্বাস্থ্যকর থাকে। অনেক সময় আগের রাতের বেঁচে যাওয়া ভাত ও তরকারি পরদিন সকালে গরম করে পরিবেশন করা হয়, এমনকি বাসি বা বারবার ব্যবহৃত তেলেও রান্না করা হয়। এসব বিষয়ে অভিযোগ জানালে হল প্রশাসন মাঝে মাঝে ডাইনিং পরিচালক পরিবর্তন করে। তবে নতুন পরিচালক শুরুতে কিছুদিন ভালো খাবার দিলেও পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।

এছাড়াও বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, ভাতের প্লেটপ্রতি(২০০গ্রাম) দাম বেড়েছে পরিমাণে তা 'দেড় প্লেট' বললেও পরিপূর্ণ এক প্লেটও হয় না। মাছ বা মুরগির মাংসের টুকরো(৪০/৫০গ্রাম) খুবই ছোট। যেখানে একজন শিক্ষার্থীর দৈনিক আমিষের চাহিদা রয়েছে ৮০-১০০ গ্রাম। 

খাবারের স্বাদ নিয়ে অনেক শিক্ষার্থী হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, কোনোমতে খেয়ে বেঁচে আছি। নিম্নমানের খাবারের কারণে অতীতে বেশ কয়েকবার শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ারও অভিযোগ আছে। এসব দুর্ভোগ সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরদারির অভাবকেই দুষছেন শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থীর দৈনিক ২,০০০ থেকে ৩,০০০ কিলোক্যালরি শক্তি এবং প্রতি কেজি ওজনের জন্য কমপক্ষে ১.২ গ্রাম প্রোটিন (আমিষ) প্রয়োজন। ডাইনিংগুলোতে নিম্নমানের, অপর্যাপ্ত এবং চড়া দামের খাবার পরিবেশন করায় শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

পঁচা, বাসি, বা বারবার পোড়ানো তেল দিয়ে রান্না করা খাবার মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। পোড়া তেলে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক (যেমন পিএএইচএস) এবং বিষাক্ত উপাদান তৈরি হয়, যা হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ায়। এছাড়া, বাসি খাবার থেকে ফুড পয়জনিং এবং ভেজাল মসলা থেকে লিভার ও হজমতন্ত্রের সমস্যা হতে পারে। 

শিউলিমালা হলের এক শিক্ষার্থী জানান, হলের খাবারের মান একেবারেই ভালো নয়। ভাত অনেক মোটা, তরকারি অনেক সময় আধা সিদ্ধ থাকে। বর্তমানে হাফ ভাতের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এমনকি তরকারি পার্সেল নিলেও পরিমাণে কম দেওয়া হয়। খিচুড়িতেও কোনো সবজি থাকে না। প্রভোস্ট ম্যাডামের সঙ্গে এসব বিষয়ে আগেও কথা হয়েছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, তাদের ও তো ব্যবসা, মেয়েরা ডাইনিংয়ে কম খায়।

দোলনচাঁপা হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, খাবারের মান একটু সাধারণ, সময়মতো পরিবেশন করা হয় এবং পরিমাণও যথেষ্ট থাকে। তবে সম্প্রতি চালের মান কিছুটা কমে গেছে, মাঝে মাঝে ভাতে পোকা পাওয়া যায়। অনেক সময় আগের রাতের সবজি গরম করে পরিবেশন করা হয় এবং হলে একই ধরনের খাবার বারবার রান্না করা হয় এতে খাওয়ার আগ্রহ কমে যায়। আগে আমাদের হলে ভাত ফ্রী ছিলো এখন প্রতি প্লেট দশ টাকা করে নেয়। হল প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি, রান্নায় সামান্য বৈচিত্র্য ও নতুন খাবার সংযোজন করলে ডাইনিংয়ের রক্ষণাবেক্ষণ এবং খাবারের মান ও উন্নত হবে। 

অগ্নিবীণা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী নাইম হোসেন জানান, ছেলেদের দুই হলের খাবারের মান প্রায় একই। কোথাও ভাত ভালো, কোথাও সবজি। তবে খাবারকে খুব একটা স্বাস্থ্যকর বলা যায় না একটু আগেই খাবারে পোকা পেয়েছি। স্টাফদের ব্যবহারও কখনো ভালো, কখনো খারাপ। আগে এখানে ভাত ৮ টাকা ছিলো এখন ১০ টাকা করেছে। হল প্রশাসনের কাছে দাবি যেনো খাবারে ভর্তুকি দেওয়া হয় এবং রান্নার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হয়ে কাজ করে, যাতে পোকা বা অস্বাস্থ্যকর কিছু না পাওয়া যায়। অনেক সময় আগের দিনের সবজি ফ্রিজে রেখে পরদিন পরিবেশন করা হয়, যা খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। প্রতিদিনের খাবার সেদিনই শেষ করা উচিত।

বিদ্রোহী হলের আবাসিক ও দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী রিফায়েত হোসেন বলেন, এখানকার খাবার মোটামুটি মানের- কিছু খাবার খুব ভালো রান্না হয়, আবার কিছু একেবারেই নিম্নমানের। তবে দামের তুলনায় অন্যান্য জায়গার চেয়ে কিছুটা ভালো বলা যায়। সমস্যা হচ্ছে, পরিবেশটি অস্বাস্থ্যকর। ফ্রিজসহ বেশিরভাগ জিনিসপত্র অপরিষ্কার থাকে। সবজি কাটার সময় ভালো ও পচা সবজি একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। রান্নার তেল বারবার ব্যবহার করে কালো হয়ে যায়, আর খাবারগুলো ঢেকে রাখা হয় না। দুই পাশের বেসিনের অবস্থাও খারাপ- বেশিরভাগ সময় সাবান থাকে না। সর্বোপরি, খাবারের মান ও পরিচ্ছন্নতা আরও উন্নত করা প্রয়োজন।

শিউলীমালা হলের প্রভোস্ট ড. হাবিবা সুলতানা বলেন, আমরা নিয়মিতভাবে খাবারের মান যাচাই করি এবং কোনো ত্রুটি চোখে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের তা ঠিক করতে নির্দেশ দিই। ভবিষ্যতে যেন নিম্নমানের চাল ব্যবহার না হয়, খাবারে কোনো পোকা বা অস্বচ্ছতা না থাকে, এবং রান্নার স্বাদে বৈচিত্র্য আসে- সেদিকে কঠোর নজরদারি করা হবে। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের পরামর্শ অনুযায়ী মাঝে মাঝে মেনুতে নতুন ধরনের খাবার যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হবে, যাতে তারা আরও আগ্রহ নিয়ে ডাইনিংয়ের খাবার উপভোগ করতে পারে।

সম্পর্কিত