শিক্ষা জাতির অগ্রগতির মূল ভিত্তি। কিন্তু যখন উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকে, তখন তা শিক্ষার্থীদের পথচলায় বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের চারটি বিভাগের তিনটিতেই নেই স্নাতকোত্তর। চারটি বিভাগের মধ্যে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ব্যতীত পরিসংখ্যান, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) এবং এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এখনো স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) প্রোগ্রাম চালু হয়নি।
ফলে স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে, যা শুধু অতিরিক্ত সময় ও অর্থব্যয়ের কারণ নয়, বরং তাদের একাডেমিক ও পেশাগত অগ্রগতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অন্যান্য বিভাগে স্নাতকোত্তর চালু থাকলেও উল্লেখিত তিন বিভাগে এখনো স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পাঠক্রম শুরু হয়নি। এর প্রধান কারণ শিক্ষক সংকট। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী-শিক্ষকের অনুপাত সাধারণত ২০:১ হওয়া উচিত হলেও, পরিসংখ্যান বিভাগে তা ৫৩:১, ইইই বিভাগে ২৩:১ এবং ইএসই বিভাগে ১৯:১। ফলে বিদ্যমান শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ থাকায় নতুন প্রোগ্রাম চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইইই বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানান, স্নাতক শেষ করতেই ছয় বছর লেগেছে, তবু স্নাতকোত্তরের সুযোগ না থাকায় অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হচ্ছে। শিক্ষক সংকট রয়েছে তবে প্রশাসনের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। আমাদের স্নাতকোত্তর চালু না থাকায় প্রায় তিন বছর পিছিয়ে পড়ছি, যা ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ইএসই বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে আমাদের বিভাগ চালু হলেও এখনো স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম চালু হয়নি। এর আগে চারটি ব্যাচ পাস করে বের হয়ে গেছে, কিন্তু তারা স্নাতকোত্তরের জন্য অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। নতুন বিভাগীয় প্রধান আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, দ্রুত স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম চালু হবে। তবে কবে চালু হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়নি।
পরিসংখ্যান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোছা. তাওয়াবুন্নাহার রুপা বলেন, আমাদের মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে পাঁচটি ব্যাচ পরিচালনা করতে হচ্ছে। স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম চালু হলে ল্যাব ও থিসিসের বাড়তি দায়িত্ব সামলানো কঠিন হবে। তবে প্রশাসন আমাদের দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের আশ্বাস দিয়েছে। নতুন শিক্ষক নিয়োগ হলে আমরা কারিকুলাম তৈরি করে অনুমোদনের জন্য আবেদন করব।
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আলী আজগর জানান, ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ হওয়ায় স্নাতক ডিগ্রিই সাধারণত চাকরির জন্য যথেষ্ট, তাই স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম এখনো চালু হয়নি। বর্তমানে শিক্ষক সংখ্যা কম থাকায় প্রোগ্রাম চালু করলে সেশনজটের ঝুঁকি আছে। তবে শিক্ষক সংখ্যা বাড়ানো হলে দ্রুতই স্নাতকোত্তর চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে, যা গবেষণার সুযোগ বাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও উপকারী হবে।
বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের ডিন ড. এ এইচ এম কামাল জানান, ডিন হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম চালুর পরামর্শ দিয়েছিলাম। তবে, শিক্ষক সংকটই এ প্রক্রিয়ার প্রধান বাধা। বিভাগগুলো পদ শূন্যতার ভিত্তিতে আবেদন করলে প্রশাসন নিয়োগের জন্য সার্কুলার প্রকাশ করবে। এখনো সার্কুলার প্রকাশিত না হলেও প্রক্রিয়াটি চলমান রয়েছে। খুব শিগগিরই স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম চালু হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, আমরা সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছি। শিক্ষক সংকট নিরসন করার জন্য ইউজিসিকে জানিয়েছি। অনুমোদন পেলেই শিক্ষক নিয়োগ হবে এবং স্নাতকোত্তর চালু করা সম্ভব হবে।
শিক্ষার্থীদের মতে, পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে বিভাগগুলোতে স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম চালু করা সম্ভব। তারা আশা করছেন, দ্রুত এ প্রোগ্রাম চালু হলে নিজেরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবেন এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হবে না। এখন প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপই তাদের মূল প্রত্যাশা ও ভরসা।